| সকাল ৭:৩৮ - শনিবার - ১৩ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ - ৩০শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ - ৩রা শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

ময়মনসিংহের অর্ধশত নদ-নদীর করুন চিত্র

লোক লোকান্তরঃ   নাব্যতা সংকট, স্বাভাবিক গতিপথে কৃত্রিম বাঁধার সৃষ্টি, বুকে পলি জমা, অবৈধ দখলধারীর আগ্রাসন, আবর্জনা ফেলে দূষণ, পাড় ভরাট, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণসহ নানা কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বৃহত্তর ময়মনসিংহের অর্ধশত নদ, নদী, উপনদী, শাখা নদী।

 

ইতোমধ্যেই দৃশ্যপট থেকে বিলিন হয়েগেছে অনেক নদী। খাল হয়ে মরা লাশের মতো পড়ে আছে কোন কোনটি। অধিকাংশ নদীই নানা সংকটে মৃত্যুর দুয়ারে দাড়িয়ে অন্তিম যাত্রার প্রহর গুনছে। আবার শেষ মূহুর্তে সভ্যতাকে আরও কিছু সেবা দিয়ে যাবার প্রত্যাশায় যেন বাঁচার আকুতিও জানাচ্ছে নদীগুলো। ‘ময়মনসিংহের অর্ধশত নদ-নদীর করুন চিত্র’ শিরোনামে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডি২৪লাইভ ডটকম ২৬ মার্চ এসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে এমনটাই প্রকাশ করে।

 

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ময়মনসিংহের প্রধান নদ পূরাতন ব্রহ্মপুত্র। এই ব্রহ্মপুত্র নদকে ঘিরেই ময়মনসিংহ শহরের গোড়াপত্তন। একদা এ নদের বুকে উত্তাল তরঙ্গ খেলা করতো। বুক চিরে তর তর করে বয়ে যেত পালতোল নৌকা, সওদাগরের বজরা।

 

বাংলাদেশের নদীমালার মধ্যে দৈর্ঘ্যে সর্ববৃহৎ এবং বিশ্বের ২২তম (২,৮৫০ কিমি) দীর্ঘ এই ব্রহ্মপুত্র নদের অবস্থা এখন খুবই রুগ্ন। শুষ্ককালে জল থাকে না, ধূ-ধূ বালিকাময় চর জেগে উঠে স্থানে স্থানে, নব্যতা হারিয়ে চরম সংকটে এখন এ নদটি।

 

প্রধান এ নদের পাশাপাশি ময়মনসিংহের ভূমি চিরে বয়ে চলা ঝিনাই, আয়মন, সুতিয়া, বানার, খিরু, ঠাডাকুড়া, ঘরোটা, সিমাহালি, নরসুন্দা, বোখাই, নিতারী, সোমেশ্বরী, কংশ, গুনাই, কাঁচামাটিয়া, পানকুরা, সাইদুল, মগরা, রাংরা, খারমোরী, মহাদেব, যদুকাটা, ধনু, বোয়ালাই, শিরখালি, সিংড়া, চেল্লাখালি, মতিচিক, চালহি, বংশাই, মানস, পুতিয়া, জিনজিরাম, সুবনফিরি, বলেশ্বর, ভোগাই কংসা, কউলাই, সিলাই, খারমেনি, সাতারখালি, তারাটিয়া, ঘাগটিয়া, ঝগড়াখালি, নবগঙ্গা, মরা নেতাই, বেনিপোড়া, রূপালী, রাঙ্গানিয়া, মেকিয়ারকান্দা, মালিঝি, খড়িয়া, বালুয়া, আনই,আখিল, বাইজানাসহ প্রায় অর্ধশত নদীর অবস্থা খুবই করুন।

নদীর মায়া, উপকারীতা, সৌন্দর্য নানা দিক বিবেচনায় আর আকৃষ্টতায় সে সময়ের প্রমত্তা আয়মন নদীর তীরে বজরা ভেড়ান আলেপশাহী পরগণার বন্দবোস্ত পাওয়া প্রথম জমিদার। সেখানেই গড়ে তুলেন মুক্তাগাছা শহর। ছোট শহরের তিনদিকে এই নদীর চলন পথ। কিন্তু সেই আয়মন নদী ক্রমে খাল হয়ে এখন বিস্মৃত স্মৃতির পথে হাঁটছে। এখানকার শাখা নদী ঠাডাকুড়ার অবস্থা আরোও করুন।

 

অন্যতম নদী বানার কিংবা সুতিয়া ভরা বর্ষায় সামান্য নড়াচড়া করলেও শুষ্ক মৌসুমে পড়ে থাকে মৃত লাশ হয়ে। নদীগুলোর বুক চিরে তখন নৌকা চলে না বরং তখন বুক জুরে জেগে থাকে বিস্তৃৃত ফসলের মাঠ। নৈসর্গিক বিবেচনায় ময়মনসিংহের নদীগুলো নারীর মতো মায়াধারী বলেই ধরে নেয়া যায়। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও কংশ ও নেতাইকে নদ হিসেবে অভিহিত করা হয়। কংশ নদের অবস্থা ভরা বর্ষায় পোয়াতি ভাব ধারণ করলেও বাকি সময়টুকু সুকরুন জীর্ণ অবস্থা। বিস্তীর্ণ চরে তখন নানা ফসলের সমাহার। তখন যেন ফসলের মাঠে এক চিলতে সরু নদীর শুয়ে থাকা অবস্থা। কংশে আর এখন শুশুকের অনবরত ডুব দেয়া কিংবা ভেসে উঠার দৃশ্য চোখে পড়েনা। ধরা পড়ে না বিকট চিতল, সুস্বাদু মহাশোল মাছ।

 

ধোবাউড়ার সাতারখালি, তারাটিয়া, ঘাগটিয়া, ঝগড়াখালি, নবগঙ্গা, মরা নেতাই, বেনিপোড়া, রূপালী নদী, রাঙ্গানিয়া, মেকিয়ারকান্দা, নদীগুলোর অতীত ইতিহাসচারিত জীবন গল্প আছে কিন্তু বর্তমান কেবলই নিঃস্তব্দতায় ঘেরা। নদীগুলোর ছিল সমৃদ্ধ অতীত, আছে পৌরানিক বাস্তবতা, নেই ভূত-ভবিষ্যৎ।

 

এগুলো হচ্ছে বেদখল, চলছে চাষাবাদ। বিভিন্ন মৌজার ম্যাপের নদী, হালট, গোপাট, সিকস্তি, আড়ংঘাটায় এখন রয়েছে ফসলের মাঠ, ঘরবাড়ি অথবা নানা গাছপালা। হালুয়াঘাট উপজেলার পাহাড়ি নদী সূর্যপুরডালা। গারো পাহাড়ের পাদদেশ বেয়ে ঝর্ণার জল, পাহাড়ির ঢল হয়ে নামে এই পথে। এখন সারা বছর অচল। এছাড়া দর্শা, গাঙ্গিনী, বুড়া ভোগাই, মেলং সেওয়াল, পচনধরা, ভোরাঘাট নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে মৃত প্রায় হয়ে শুয়ে থাকে শীতকালের লাউ ডগা সাপ সদৃশ।

 

তারাকান্দায় নৌ আবহাওয়া দফতর থাকলেও তারাকান্দা কিংবা ফুলপুর উপজেলার উপনদীগুলোতে নৌপথ নেই। চলে না কোন নৌযান। তারাকান্দার ছোট নদীর নাম রাংসা হচ্ছে ধ্বংস। গ্রামের ভিতের আকাঁবাকাঁ পথহারা নদী মালিঝি। খড়িয়া নদীতে খরা আর জলাবদ্ধতাই শেষ কথা। গৌরীপুর উপজেলার বালুয়া নদী সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। বর্ষাকালে নৌকাডুবিতে সলিল সমাধি হলে নাম ভূমিকায় উঠে আসে এই নদী।

 

কালোমাটির জন্য বিখ্যাত নদী কাঁচামাটিয়া ঈশ্বরগঞ্জ-নান্দাইলের নদী। খনিজ সম্ভাবনাপূর্ণ এ নদী বর্ষা ছাড়া অন্যান্য মৌসুমে ধান ক্ষেত হয়ে পড়ে থাকে। ফুলবাড়ীয়া উপজেলা সদরের আখিল, বানার, আনই, একেকটি নদীর নাম বড়ই মায়াময়। এসব নদীতে নৌকা চলে না। মাছ থাকে না। কিংবদন্তী রয়েছে আনই নদী থেকে বৃহত্তর জলাশয় বড়বিলার বিলের সঙ্গে গুপ্ত সুড়ং সংযোগ ছিল। এখন গানের পয়ারের মতো নয়া কিংবদন্তী হাবার অপেক্ষায় এই বলে যে, এইখানে একটা নদী ছিল এখন আর নদী বলে কোনো কিছু নেই। ত্রিশালের সুতিয়া, শিলা ও খিরু দক্ষিণ ময়মনসিংহের বড় নদী। এখন ছোট খাল। ভালুকার সুতিয়া, খিরু ও শিমুলিয়ার একাত্তরের যুদ্ধ স্মৃতিসহ রয়েছে নানা কিংবদন্তি। অযতœ, অবহেলা, দখলদারের লুলোভ দৃষ্টি নানা কারনেই নদীগুলো অস্তিত্ব সংকটে। ময়মনসিংহ জেলার ১২ উপজেলার ৪৭টি নদী, উপনদী বা শাখা নদীর উজ্জ্বল অতীত থাকলেও বর্তমান বড়ই করুন। ভবিষ্যৎ আরো শংকার।

জেলার সুতিয়া, শীলা, বানার, নরসুন্দা, কাঁচামাটিয়া, কংস, নেতাই, ক্ষীরু, মেনান, শাওয়াল নদ-নদীগুলোও পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছ। একসময়ের ঢেউ তোলা এ নদ-নদীগুলো হারিয়েছে যৌবন। এসকল নদীগুলোতে এখন আর বান ডাকে না। শুষ্ক মৌসুমে এর বুক চিরে জেগে উঠা চরে কিশোররা মেতে ওঠে ক্রিকেট-ফুটবল খেলায়। অথচ একসময় এসব নদ-নদীতে চলাচল করত বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার, রেলওয়ে ওয়াগন জাহাজ।

 

বৃহৎ নদের ব্রহ্মপুত্রের খোঁজ নিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদের কোথাও কোথাও এখন একেবারেই ক্ষীণ জলরাশি। পায়ে হেঁটেই পারাপার হচ্ছে মানুষ। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছেন, একসময় ব্রহ্মপুত্র নদের প্রশস্ততা ছিল ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার। আজ তা ভরাট হতে হতে স্থানভেদে ১০০ থেকে ২০০ মিটারে ঠেকেছে। নদের নেই সেই নাব্যতা। একসময়ের খরস্রোতা এ নদ আজ মরা খালের পরিনতির পথে।

 

ভারত সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট-ধোবাউড়ায় কংস, নেতাই, ক্ষীরু, মেনান, শাওয়াল নদ-নদীগুলো পাহাড়ি ঢলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখন পাহাড়ি ঢল নামলেও পলি জমার কারণে পানি নেই। এ ছাড়া সুতিয়া, শীলা, বানার, নরসুন্দা, কাঁচামাটিয়া নদ-নদীর পানি নির্ভরশীল ব্রহ্মপুত্রের ওপর। ব্রহ্মপুত্রের খনন নেই বলে ওই নদ-নদীগুলোও সরু খালে পরিণত হয়েছে।

 

বিভিন্ন উপজেলায় নানা প্রকল্পের মাধ্যমে ছোট ছোট নদীগুলো খনন করার উদ্যোগ নেয়া হলেও অনিয়মের কারনে তা আরো হিতে বিপরীত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের মন্তব্য। এসব নদী খননের নামে সরু থেকে সরুতর করে অবৈধ দখলদারদের জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে জানা গেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ ও প্রাচীন নদ ব্রহ্মপুত্র। ব্রিটিশ আমলে ব্রহ্মপুত্রের মূল অববাহিকা ছিল জামালপুর ও ময়মনসিংহ হয়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলার পুর্ব পাশ দিয়ে। ওই সময় এ নদ মেঘনার সঙ্গে মিলিত হতো ভৈরবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্রিটিশরা গড়ে তুলেছিল বাহাদুরাবাদ ও ফুলছড়ি, চিলমারী নৌবন্দর।

 

দীর্ঘ বছরের ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে ফেরিঘাট বাহাদুরাবাদ-বালাশী যাত্রী ও ওয়াগন ফেরি চলাচল করত। পানি সংকটের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ নিয়ামত আলী বলেন, নদ শুকিয়ে যাওয়ায় এখন আর বোয়াল, বড় পাঙ্গাশ, আইড়, রুই, কাতল ইত্যাদি পাওয়া যায় না। নদ কেন্দ্রিক মৎস্যজীবীরাও পেশা পাল্টে ফেলেছে।

 

ময়মনসিংহ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদসহ ময়মনসিংহের সকল নদীই এখন নাব্যতা সংকটে। নদীগুলো খননের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। ব্রহ্মপুত্র নদ বা ব্রহ্মপুত্র নদী এশিয়া মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। সংস্কৃত ভাষায় ব্রহ্মপুত্রের অর্থ হচ্ছে ব্রহ্মার পুত্র। ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব নাম ছিল লৌহিত্য।

 

আবার তিব্বতে তা জাঙপো নামে পরিচিত, এবং আসামে তার নাম দিহাঙ (বাংলাপিডিয়া)। ব্রহ্মপুত্রের উৎপত্তি হিমালয় পর্বতমালার কৈলাস শৃঙ্গের নিকট জিমা ইয়ংজং হিমবাহে, যা তিব্বতের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। জাঙপো নামে তিব্বতে পুর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে এটি অরুণাচল প্রদেশে ভারতে প্রবেশ করে যখন তখন এর নাম হয়ে যায় সিয়ং।

 

তারপর আসামের উপর দিয়ে দিহাঙ নামে বয়ে যাবার সময় এতে দিবং এবং লোহিত নামে আরো দুটি বড় নদী যোগ হয় এবং তখন সমতলে এসে চওড়া হয়ে এর নাম হয় ব্রহ্মপুত্র। ব্রহ্মপুত্র হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গের নিকটে মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে তিব্বত ও আসামের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

 

ময়মনসিংহের দেওয়ানগঞ্জের কাছে ব্রহ্মপুত্র দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে ময়মনসিংহ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরববাজারের দক্ষিণে মেঘনায় পড়েছে। ১৭৮৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের স্রোতে দিক পরিবর্তিত হয়ে যমুনা নদী হয়। উৎপত্তিস্থল থেকে এর দৈর্ঘ্য ২৮৫০ কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্র নদের সর্বাধিক প্রস্থ ১০৪২৬ মিটার। এটিই বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। ব্রহ্মপুত্রের প্রধান শাখা হচ্ছে যমুনা। এক কালের প্রশস্ত ব্রহ্মপুত্র নদ বর্তমানে শীর্ণকায়।


নদ-নদী রক্ষায় পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন নানা সময় আন্দোলনসহ নানাভাবে দাবী জানিয়ে আসছে। ব্রহ্মপুত্র নদকে ড্রেজিং করার দাবীতে ময়মনসিংহ শহরে মাঝে মাঝে আন্দোলন হলেও তাতে কর্ণপাত নেই কর্তৃপক্ষের। মানচিত্র ধরে ধরে বেদখল হয়ে যাওয়া নদীগুলো উদ্ধার করে নাব্যতা ফিরিয়ে এনে চলমান করার দাবী সর্বসাধারণের। ব্রহ্মপুত্রসহ যে নদ-নদীগুলো টিকে আছে তাদের যৌবন ফিরিয়ে দিতে সরকারের সব ধরণের প্রচেষ্টাও প্রত্যাশা করেন সকলে।

 

ছবিঃ সংগৃহীত

সর্বশেষ আপডেটঃ ৩:০০ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ২৬, ২০১৭