| রাত ১০:৩৩ - বৃহস্পতিবার - ১১ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ - ২৮শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ - ১লা শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

আজ ফুলবাড়ীয়ার শুরু হবে জমিদারী আমলের হুমগুটি খেলা

ফুলবাড়ীয়া ব্যুরোঃ   প্রায় দুই শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী খেলা হল হুমগুটি। পৌষ সংক্রান্তির শেষ বিকেলে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার লক্ষীপুরের বড়ই আটায় চলে হুমগুটি নামক এই খেলা। আর পৌষ মাসের শেষ দিনের এই দিনকে স্থানীয়রা পহুরা বলে সম্বোধন করে। পিতলের তৈরী গুটি করাকারি করে নিজ গ্রামে নিয়ে গুম করা পর্যন্ত চলে এ খেলা।

 

ময়মনসিংহ-ফুলবাড়ীয়া সড়কের লক্ষীপুর ও দশ মাইলের মাঝা মাঝি বড়ই আটা বন্ধে (পতিত জমি) খেলার কেন্দ্রস্থল। ময়মনসিংহ সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে এই জায়গা। প্রতিবছরই বিকেল ৪ টার দিকে খেলা শুরু হয়।

 

আজ শুক্রবার ১৩ জানুয়ারী বাংলা ৩০ শে পৌষ জমজমাট হুমগুটি খেলাকে কেন্দ্রকরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় মেতাবে লক্ষাধিক মানুষ। লক্ষীপুরে বিকেল বেলা ঐতিহ্যের এক বিরল অনবদ্য পটভূমিতে খেলার আশপাশের গ্রামগুলোতে জড়ো হবে লাখো মানুষ। যদিও তারা খেলার নাকাল পাবে না, তবুও দর্শক হিসেবে থাকার আনন্দ থেকে বাদ যেতে চায় না কেউ। হুমগুটি স্মৃতি সংসদ সভাপতির উপস্থিতিতে খেলা উদ্ভোধন করা হবে।

 

সকাল থেকে ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও পাশ্ববর্তী ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলার লোকজন আসতে শুরু করবে লক্ষীপুর বড়ই আটা বন্ধে আর লাখো কন্ঠে উচ্চারিত হবে জিতই আবা দিয়া গুটি ধররে….হেইও।

 

৪০কেজি ওজনের পিতলের গুটি ঢাক ঢোলের তালে তালে নেচে গেয়ে তালুক পরগনার সীমানায় নিয়ে আসে। প্রতি বছর পৌষের শেষ বিকেলের এ খেলাকে ঘিরে অতি প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষীপুর, বড়ই আটা, ভাটিপাড়া বালাশ্বর, শুভরিয়া, কালীবাজাইল, তেলিগ্রাম, সারুটিয়া, গড়বাজাইল, বাসনা, দেওখোলা, কুকরাইল, বরুকা, ফুলবাড়ীয়া পৌর সদর, আন্ধারিয়াপাড়া, জোরবাড়ীয়া, চৌদার, দাসবাড়ী, কাতলাসেনসহ আশে পাশের ১৪/১৫টি গ্রামে শুরু হয় উৎসবের আমেজ।

 

শতাধিক গরু-ছাগল জবাই হয় গ্রামের বিভিন্ন স্থানে। গুটি খেলা এক নজর দেখার জন্য দূরদূরান্তের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা পড়ে নতুন জামা কাপড় পরে স্বজনদের সাথে ভীড় জমায় এ গ্রামে।

 

এ খেলায় থাকে না কোন রেফারী বা আমপায়ার। আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন প্রকার বাহিনীর প্রয়োজন হয় না। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেলা। কোন কোন বছর পরদিন পর্যন্ত খেলা চলার রেকর্ডও আছে। একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ঐ নিশানা দেখে বুঝা যায় কারা কার পক্ষের লোক। গুটিটি কোন দিকে যাচ্ছে তা মুলত চিহিৃত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটিটি গুম না হওয়া পর্যন্ত চলে এ খেলা।

 

স্থানীয়রা জানান, বাপ-দাদারা বলতো তারাও দেখেছে খেলা চলে আসতে। মাইক মারতে (প্রচার) হয়না, সময়ও বলতে হয় না। খেলা এক নজর দেখার জন্য দূরদূরান্তের মানুষ ভীড় জমায় এ গ্রামে।

 

লক্ষীপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ময়মনসিংহ জেলা অটো টেম্পু সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম বাবুল জানান, ২৫৮তম খেলা হবে এটি। আমরা সব সময় খেলা খেলে থাকি। স্থানীয় আবু বকর সিদ্দিক খেলাটি পরিচালনা করে থাকেন।

 

আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, খেলার উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ময়মনসিংহ পৌর সভার মেয়র ইকরামুল হক টিটু। উদ্বোধক হিসেবে থাকবেন ময়মনসিংহ আকুয়া ইউপি চেয়ারম্যান আফাজ উদ্দিন সরকার। বিশেষ অতিথি থাকবেন জেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ কদ্দুছ, জেলা পরিষদ সদস্য আলহাজ্ব তাজুল ইসলাম বাবলু, মো: রুহুল আমিন, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: ইমামুল হক সেবলু, বাকৃবি’র সাবেক রেজিষ্ট্রার মো; আব্দুল খালেকসহ দেওখোলা ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান হাদী, সাবেক চেয়ারম্যান আশিকুল হক আশিক, বালিয়ান ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফ উজ্জামান, সাবেক চেয়ারম্যান মোতালেব হোসেন সরকার।

 

ইতিহাসঃ

মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সাথে ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূ-খন্ডে দুই নীতির প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে।

 

জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মিমাংসা কল্পে লক্ষীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে, যেখানে শুরুতালুক-পরগনার সীমানা, সেখানে এ গুটি খেলার আয়োজন করে। গুটি খেলার শর্ত ছিল গুটিটি যে দিকে যাবে তা হবে তালুক পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা । জমিদার আমলের সেই গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়।

 

সেই থেকে তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারী খেলার গোরাপত্তন। আমন ধান কাটা শেষ, বোর ধান আবাদের আগে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য জমিদারদের এই পাতানো খেলা চলছে বছরের পর বছর ধরে।

 

ছবিঃ লোক লোকান্তর

সর্বশেষ আপডেটঃ ২:২৭ পূর্বাহ্ণ | জানুয়ারি ১৩, ২০১৭