| সকাল ৬:২৩ - বৃহস্পতিবার - ৯ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ - ২৬শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ - ১৭ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

ভারতীয় চাল আমদানির প্রভাব : শেরপুরে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন চাল অবিক্রিত : লোকসান দিয়ে সুগন্ধি চাল বিক্রি

 

শেরপুর প্রতিনিধি: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, শুৃক্রবার,
ভারতীয় চাল আমদানির ফলে বাজার মূল্য ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় শেরপুরের চাল ব্যবসায়ীরা লোকসান দিয়ে বিক্রি করছেন সুগন্ধি আতব চাল। চাহিদা ও পর্যাপ্ত ক্রেতার অভাবে বাজারে আতব চালের দাম কমে গেছে। গত মওসুমে উৎপাদিত প্রায় দশ হাজার মেট্রিক টন আতব চাল বিভিন্ন চালকলে অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে জেলার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ এ কৃষি শিল্পটি বর্তমানে হুমকির সম্মুখিন এবং মূলধনের অভাবে অনেক চালকল বন্ধ হয়ে গেছে। এ শিল্পটিকে রড়্গার জন্য ভারতীয় চাল আমদানি বন্ধের পাশাপাশি বিদেশে সুগন্ধি আতব চাল রপ্তানির উদ্যোগ নিতে স্থানীয় চাল ব্যবসায়ীরা সরকারের নিকট আহবান জানিয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, শেরপুর সূত্রে জানা গেছে, খাদ্যে উদ্বৃত্ত শেরপুর জেলায় বিগত আমন মওসুমে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে তুলশীমালা, চিনিগুড়া, চিনি সাগর, কালজিরা ও রসমালা জাতের সুগন্ধি মিহি (সরম্ন) আতব ধান আবাদ করা হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের বাম্পার ফলন হয়।
জেলা চালকল মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি বছরের ফেব্রম্নয়ারী-মার্চ মাসে জেলার ৫টি উপজেলা ছাড়াও ময়মনসিংহের দুর্গাপুর, গৌরীপুর, ফুলপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকা মণ দরে (৪০ কেজি) সুগন্ধি আতব ধান ক্রয় করা হয়। ৭০ থেকে ৭৫ কেজি ধানে এক মণ চাল উৎপন্ন হয়। সে হিসেবে এক মণ চালের উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় দুই হাজার ৪০০ টাকা।
কিন’ চালের চাহিদা কমে যাওয়ায় বর্তমানে শেরপুরের বিভিন্ন বাজারে প্রতি মণ উন্নতমানের সুগন্ধি চাল বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ১০০ টাকা থেকে দুই হাজার ১৫০ টাকায়। ফলে প্রতি মণ চালে ব্যবসায়ীরা আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ টাকা লোকসান দিচ্ছেন। তারপরও নগদ টাকায় ওই চাল বিক্রি করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী গত মওসুমে উৎপাদিত চাল নষ্ট হওয়ার আশংকায় লোকসান দিয়ে বিক্রি করছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন চালকলে প্রায় দশ হাজার মেট্রিক টন সুগন্ধি আতব চাল অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে চাল ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ টাকা ড়্গতির সম্মুখিন হয়েছেন।
সরেজমিনে শেরপুর জেলা শহরের ঢাকলহাটি, শীতলপুর, দীঘারপাড় ও কান্দাপাড়া এলাকার কয়েকটি চালকলে গিয়ে যায়, এসব চালকলের গুদামে বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি আতব চাল অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গুদামে বসত্মাগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা রয়েছে। চাল বিক্রি না হওয়ায় অর্থাভাবে চালকলগুলোয় নতুন করে চাল উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
এসময় ঢাকলহাটি এলাকার লোকনাথ অটো রাইস মিলের মালিক গৌতম চন্দ্র সাহা বলেন, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে সুগন্ধি চালের সবচেয়ে বড় আড়ত শেরপুরে। এ জেলার শতাধিক চালকল মালিক রাজধানী ঢাকার চাহিদার অর্ধেক চাল এ জেলা থেকে সরবরাহ করে থাকেন। কিন’ এ বছর সুগন্ধি আতব চালের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। বর্তমানে তাঁর (গৌতম) চালকলে উৎপাদিত সাত হাজার মণ সুগন্ধি আতব চাল অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চলতি মৌসুমে মণ প্রতি তিনশত টাকা লোকসান দিয়ে কিছু চাল বিক্রি করেছেন। ভারত থেকে শুল্কমুক্ত চাল আমদানির কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি জানান।
কামাল অটো রাইস মিলের মালিক মো. কাসেম মোলস্না বলেন, বর্তমানে তাঁর মিলে দশ হাজার মণ সুগন্ধি আতব চাল অবিক্রিত পড়ে আছে। ভারতীয় চাল অবাধে আমদানির ফলে ঢাকার আড়তে শেরপুরের চালের চাহিদা কমে গেছে। তাই অনেকেই চাল কিনছেন না। ভারত থেকে চাল আমদানি বন্ধের জন্য তিনি দাবি জানান।
শ্যামলী এন্ড আরিফ অটো রাইস মিলের মালিক মো. আরিফ রেজা বলেন, ২০১৩ ও ২০১৪ সালের আমন মৌসুমে উৎপাদিত দশ হাজার মণ সুগন্ধি আতব চাল তাঁর মিলে অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা আর্থিক ড়্গতির সম্মুখিন হয়েছেন।
জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও যমুনা রাইস মিলের মালিক আসাদুজ্জামান রওশন বলেন, জেলার অনেক চালকল মালিক এবং খাদ্য ব্যবসায়ী বিগত মওসুমে বিভিন্ন ব্যাংক হতে চলতি মূলধন এবং পেস্নজ লোন গ্রহণের মাধ্যমে সুগন্ধি আতব ধান কিনে চাল তৈরিপূর্বক ব্যাংকের হেফাজতে গুদামজাত করে রাখেন। গুদামজাত করার কিছুদিন পরই আতব চালের বাজারে দারুণ মন্দা দেখা দেয়। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী মজুতকৃত চাল লোকসান দিয়ে বিক্রি করায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক দিক থেকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন এবং ব্যাংকের দেনা পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই চালকল বন্ধ করে দিয়েছেন।
জেলা চালকল মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও শম্পা রাইস মিলের মালিক মো. শহীদুলস্নাহ বলেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে এবং দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। কিন’ ভারত থেকে সুগন্ধি আতব চালসহ বিভিন্ন ধরণের চাল আমদানি করায় শেরপুরে উৎপাদিত এ ধরণের উচ্চমানের চালের দাম ব্যাপকহারে কমে গেছে। ফলে খাদ্য ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ড়্গতিগ্রসত্ম হচ্ছেন এবং তাঁদের মধ্যে খাদ্য ব্যবসা নিয়ে এক ধরণের হতাশাব্যাঞ্জক অবস্থা বিরাজ করছে।
তিনি ভারত থেকে চাল আমদানি বন্ধ করার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে বিদেশে সুগন্ধি আতব চাল রপ্তানির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শেরপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক একরামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ভারত থেকে চাল আমদানির বিষয়টি সম্পূর্ণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। স্থানীয়ভাবে খাদ্য বিভাগের কিছু করণীয় নেই। তবে চালকল মালিকরা এ ব্যাপারে আবেদন করলে তা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে বলে তিনি জানান।

সর্বশেষ আপডেটঃ ৫:৫৫ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৫