| দুপুর ১:২৭ - রবিবার - ২৩শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ - ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ - ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

আজ অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

লোকলোকান্তর ডেস্কঃ  অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মায়ের ভাষার দাবিতে বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমান্বিত এক দিন। বাঙালির আত্মগৌরবের স্মারক অমর একুশের প্রথম প্রহর থেকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে মহান ভাষা শহীদদের। মধ্যরাতের পর মানুষের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনার। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিনটিকে ঘিরে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে নানা কর্মসূচি। মধ্যরাতের পর থেকে সারা দেশের শহীদ মিনারে শুরু হয় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। সকালে খালি পায়ে প্রভাত ফেরির মাধ্যমে শহীদদের জানানো হবে শ্রদ্ধা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেয়া হয়। এরপরই ঢল নামে সাধারণ মানুষের। নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ফুল হাতে সারি বেঁধে এগিয়ে যান শহীদ বেদির দিকে। শ্রদ্ধা নিবেদনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা গতকাল থেকেই ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সঙ্গে সারা দেশের শহীদ মিনারগুলোতেও একুশের প্রথম প্রহর থেকে চলে শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা। সবার কণ্ঠে ছিল অমর সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে  ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি..।’
দিবসটি উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে রেডিও, টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২-এ জীবন দিয়েছিল সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়েই আজকে মুখে মুখে বাংলা ভাষা। বাংলায় রচিত হচ্ছে হাজারো গান, কবিতা, নাটক, উপন্যাস আর অজস্র কথামালা। আজকের দিনটি শুধু সেই বীর ভাষাসৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর, যারা ভাষার জন্য অকাতরে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আজকের দিনটি কেবল বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের সব প্রান্তে পালিত হবে বীরের রক্তস্রোত আর মায়ের অশ্রুভেজা অমর একুশে। বাঙালির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এরপর থেকেই যথাযোগ্য মর্যাদায় সারা বিশ্বে একযোগে পালিত হয়ে আসছে দিনটি।
৬৪ বছর আগের এই দিনে বাংলার সংগ্রামী ছেলেরা যে ত্যাগ ও গৌরবগাথা রচনা করেছিলেন, তারই পথ ধরে আমরা মুখোমুখি হই স্বাধীনতা সংগ্রামে। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাভ করি লাল সবুজের পতাকা। ১৯৫২ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলনরত বাঙালি রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে হরতালের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টায় একটানা এক মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র হরতাল, সভা, মিছিলের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্ররা দলে দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমায়েত হয়। ঐতিহাসিক আমতলায় ছাত্রদের সভা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরিকল্পনা করা হয়, চারজন চারজন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার। ছাত্ররা মিছিল শুরু করলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাকে তুলতে থাকে। বিকাল ৩টায় গণপরিষদের অধিবেশনের আগেই শুরু হয়ে যায় ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ। বিকাল ৪টায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। বুলেট কেড়ে নেয় জব্বার ও রফিকের প্রাণ। গুলিবিদ্ধ আবুল বরকত রাত পৌনে আটটায় হাসপাতালে মারা যান। তাদের মৃত্যু সংবাদে বাংলা ভাষার প্রাণের দাবি সারা দেশে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারি অমর ভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শহীদদের স্মরণে সারা দেশে তৈরি হয় অসংখ্য শহীদ মিনার।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গতকাল বিকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা ছিল নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। শহীদ মিনারমুখী সব রাস্তায় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সতর্ক পাহারা। তাদের সঙ্গে পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের কয়েক হাজার সদস্য। সন্ধ্যার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকার ছাড়া কোনো গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, অমর একুশে উদযাপনের জন্য শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পুরো রাজধানীতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার থাকবে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা দিতে পুরো এলাকায় ছিল চার স্তরের নিরাপত্তা। সব মিলিয়ে ৯০০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন পুরো এলাকায়। এছাড়া র‌্যাব সদস্যরাও পুরো এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামীকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিকাল তিনটায় অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন। বিএনপির পক্ষ থেকেও বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করা হবে।
গণতন্ত্র ফেরাতে প্রেরণা জোগাবে একুশের আত্মদান : খালেদা
ভিন্ন কায়দায় আমাদের ভাষা সংস্কৃতির ওপর বিদেশি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। খালেদা জিয়া বলেন, আজও একুশের অম্লান চেতনা সকল ষড়যন্ত্রকারী আধিপত্যবাদী শক্তিকে রুখতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে। তাই এই দুঃসময়ে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে আমাদের প্রেরণা  জোগাবে ’৫২-এর মহান একুশের শহীদদের আত্মদান। তিনি বলেন, ২১শে  ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে এক তাৎপর্যময় দিন। বায়ান্ন’র পথ ধরেই এদেশের সকল গণতান্ত্রিক এবং স্বাধিকারের সংগ্রাম সমপ্রসারিত হয়েছে। অর্জিত হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা। ’৫২-এর ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে খালেদা জিয়া তিনি বলেন, ভাষাসৈনিকদের জানাই শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন, তাদের সুখ, শান্তি ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শহীদ মিনারে খালেদার শ্রদ্ধা
এদিকে একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহান ভাষা শহীদের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।  প্রেসিডেন্ট এডভোকেট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও তিন বাহিনীর প্রধানের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। এসময় তার সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্যসহ দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, গত বছরের শুরুতে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। সেজন্য ওই বছর শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যেতে পারেননি তিনি।

সর্বশেষ আপডেটঃ ২:৩৯ পূর্বাহ্ণ | ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৬