| সকাল ৮:৩৫ - মঙ্গলবার - ৯ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ - ২৫শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ - ১০ই মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি

বড়ইতলা গণহত্যা দিবস সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতি আজো তাড়া করে কালু মিয়াদের

 

সিম্মী আহাম্মেদ, কিশোরগঞ্জ, ১২ অক্টোবর ২০১৫, সোমবার,
পাকবাহিনী কিশোরগঞ্জ শহরে প্রবেশ করেছিল একাত্তরের ১৯ এপ্রিল। তারা শহর ছেড়ে চলে যায় ৪ ডিসেম্বর। এই ৮ মাসে কিশোরগঞ্জের বড়ইতলা, মনিপুরঘাট, শোলমারা, ইটনার ভয়রা, নিকলীর গুরম্নইসহ জেলার বিভিন্ন স’ানে গণহত্যার মাধ্যমে তাদের নৃশংসতার স্বাক্ষর রেখে যায়। এর মধ্যে ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ শহরের অনতিদূরে বড়ইতলা গ্রামে ঘটে সবচেয়ে পৈশাচিক ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। এই দিনে স’ানীয় দোসরদের সহায়তায় পাকিসত্মানি হানাদার বাহিনী পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের ৩৬৫ জন মানুষকে কাতারবন্দি করে একসঙ্গে হত্যা করেছিল। এক দিনে একসঙ্গে এতগুলো মানুষকে হত্যার ঘটনা খুবই বিরল। আজো সেদিনের কথা মনে করে এলাকাবাসী ও শহীদদের স্বজনেরা শিউরে ওঠেন। সেদিনের হত্যাযজ্ঞ থেকে আহত অবস’ায় বেঁচে যাওয়া লোকজন আজো সেই ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাকরম্নদ্ধ হয়ে পড়েন।
সেদিন কপালে বেয়নেটবিদ্ধ হয়েছিলেন চিকনিরচর গ্রামের কালু মিয়া (৭৫)। ৪৩ বছর ধরে সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। কালু মিয়া জানান, তাদের চিকনীরচর গ্রামটি হানাদাররা ঘেরাও করলে তিনি পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। এরপর তাকে বড়ইতলায় নিয়ে আসা হয়। সে তার সামনে সারি সারি গ্রামবাসীকে গুলি করে আর বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে পাকবাহিনী। এক পর্যায়ে তাকেও কপালে বেয়নেট দিয়ে আর মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে লাশের স’পের ওপর পড়ে থাকেন। হানাদাররা তাকে মৃত ভেবে এভাবেই তাকে ফেলে রেখে যায়। পরদিন সকালে পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক মহিলা তাকে উদ্ধার করেন। বহুদিন চিকিৎসা করিয়ে সেরে ওঠেন। কিন’ কপালে বেয়নেটের সেই ড়্গতচিহ্ণ আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন। একই গ্রামের বৃদ্ধ ভিক্ষুক হাছু মিয়া (৯৫) জানান, সেদিন তার ঘরটি হানাদাররা পুড়িয়ে দেয়। আজো তিনি ঘরটি মেরামত করতে পারেননি। বড়ইতলা গ্রামের মাছুম আলী জানান, সেদিন হানাদাররা অনেকের সঙ্গে তাকেও ধরে এনেছিল। বড়ইতলায় রেললাইনের পাশে দাঁড় করিয়ে তাদের কয়েকজনকে বলা হয় যেন তারা রাজাকারদের সহায়তা করেন, খাবার সরবরাহ করেন এবং পাকিসত্মান জিন্দাবাদ বলেন। আর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান পেলে যেন হানাদারদের জানান। এরপর তাদের কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন’ অন্যদের আর মুক্তি মিলল না, কয়েক মুহুর্তে এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে চিরতরে তাদের প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হয়।
চিকনিরচর গ্রামের শুক্কুর বানু ও শেওরা গ্রামের সারবানু। দুজনেরই বয়স সত্তরের কাছাকাছি। তারা ওইদিন তাদের স্বামী হারিয়েছেন। হারিয়েছেন ঘরবাড়ি-সম্পদ। বিচার দূরে থাক, তাদের কষ্টের কথা শুনতেও কেউ কোনোদিন তাদের কাছে আসেনি। রেজিয়া আক্তার তখন দুই সনত্মানের জননী। স্বামী জয়নাল আবেদিন ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন। ওইদিন তিনি স্বামী, দেবরসহ দুই ভাইকে হারান। তিনি জানান, খেয়ে না খেয়ে দিনগুলো কেটেছে, এখনও অভাবের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন, কিন’ কেউ কোনোদিন তাদের কষ্টের খবর নিল না। প্রতি বছর স্মৃতিসৌধে ফুল দেওয়া হয়, দূর থেকে তা-ই দেখি। এলাকার মঞ্জিল মিয়া জানান, তার বাবা, চাচা, ভাই, চাচাতোভাই, দাদা, ভাতিজাসহ পরিবারের ২২জনকে ওইদিন হত্যা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর সকালে একদল পাকসেনা ট্রেন যোগে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের নিকটবর্তী কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের বড়ইতলা গ্রামে আগমন করে। উদ্দেশ্য ছিল বড়ইতলা সহ আশপাশের গ্রামের মানুষজনকে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিরম্নদ্ধে ও পাকিসত্মানের পক্ষে সংঘটিত করা। কিন’ বড়ইতলা গ্রামে প্রবেশের পর পথ হারিয়ে দুইজন পাকসেনা দলছুট হয়ে পড়ে। কথিত উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী চলাকালে নিজেদের দলের দুই সদস্যের স্বল্পতার বিষয়টি পাকসেনা কর্মকর্তাদের নজরে আসে। এ সুযোগে স্থানীয় রাজাকাররা পাকবাহিনীর নিকট এই মর্মে গুজব রটিয়ে দেয় যে, গ্রামবাসীরা দুই পাকসেনাকে গুম করে ফেলেছে। এ সংবাদের সত্যতা যাচাই না করেই পাকবাহিনী উন্মত্ত পশুর হিংস্রতা নিয়ে গ্রামবাসীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকসেনা ও তাদের স্থানীয় দোসররা বড়ইতলা, চিকনিরচর, দামপাড়া, কালিকাবাড়ি, কড়িয়াইল, তিলকনাথপুর, গোবিন্দপুর ও ভূবিরচর গ্রামের পাঁচ শতাধিক লোককে জোরপূর্বক ধরে এনে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেল লাইনের পাশে বড়ইতলা গ্রামের একটি স্থানে জড়ো করে। এক পর্যায়ে জড়ো হওয়া গ্রামবাসীদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে পাকসেনারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে ও গুলি করে শুরম্ন করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। বর্বর এ হত্যাযজ্ঞে ৩৬৫ জন নিহত এবং আরও দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়।
ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এ নৃশংসতম গণহত্যার শহীদদের স্মরণে বড়ইতলার নামকরণ করা হয় শহীদনগর। উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের। ২০০০ সনে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ৬৬৭ বর্গফুট এলাকা জুড়ে ২৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট স্মৃতিসৌধটির নির্মাণ করা হয়। স্মৃতিসৌধটির ভিত্তিপ্রস’র স্থাপন করেন তৎকালীন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) এবং নকশা প্রণয়ন করেন সজল বসাক। স্মৃতিসৌধের ফলকে খোদাই করা শহীদদের নাম মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই রক্তাক্ত ভয়াল দিনে। প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর স্মৃতিসৌধের বেদীতে প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পসত্মবক অর্পন করে। তবে স্মৃতিসৌধের কয়েক জায়গায় ফাটল ধরেছে। সংস্কার না করলে হয়ত এটি অচিরেই ধ্বসে পড়তে পারে বলে এলাকাবাসী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

সর্বশেষ আপডেটঃ ৫:৩৪ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ১২, ২০১৫