| ভোর ৫:৩৬ - শুক্রবার - ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ - ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ - ৩রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

অনৈতিক মাছ চাষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক,  ২৯ জুলাই ২০১৫, বুধবার:

 প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী, খাল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে মৎস্য চাষের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিছু ব্যক্তি সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী, খাল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাশয়ে অনৈতিকভাবে মাছ চাষ করছে। এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। কোন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আমাদের নদী ও জলাশয়গুলো ধ্বংস করছে, এটা আপনাদের দেখতে হবে এবং তারা যে-ই হোক না কেনো তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আজ রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন অডিটোরিয়ামে মৎস্য সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণকালে এ নির্দেশ দেন।
মৎস্য অধিদপ্তর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ সায়েদুল হক। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিনা আফরোজ ও মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
মৎস্য খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করতে ‘সাগর নদী সকল জলে, মাছ চাষে সোনা ফলে এই প্রতিপাদ্য নিয়ে এ বছরের ২০১৫ মৎস্য সপ্তাহ গতকাল থেকে শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবন এলাকায় গড়াই ও মধুমতি নদী এবং ঘাসিয়াখালী খাল খননের কথা উল্লেখ করে বলেন, ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের সংলগ্ন নদী ও খালগুলোর পানি প্রবাহ বেড়ে গেলে, এর লবণাক্ততায় সুন্দরবন হ্রাস পেত। কিন্তু সুন্দরবন এলাকায় নদী ও খালগুলোতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে মাছ চাষ চলছে, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও এর সংলগ্ন নদী ও খালগুলোর জন্য ক্ষতিকর। এজন্য এক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ঘাসিয়াখালী খালের খনন শুরু করেছে। এই ঘাসিয়াখালী খালের সঙ্গে ছোট ও বড় অনেক খাল যুক্ত হয়েছে। কিন্তু কিছু ব্যক্তি পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ঘের তৈরির মাধ্যমে এসব খালে অনৈতিকভাবে মাছ চাষ করছে।
প্রধানমন্ত্রী এসব অঞ্চল ঘুরে এভাবে অনৈতিক পন্থায় মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে খুলনা অঞ্চলের অধিবাসী মৎস্য প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে অবৈধ মাছ চাষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি মাছ রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্তদের রফতানিকৃত মাছের মান নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়ে অনৈতিক পন্থা অবলম্বনকারীদের সতর্ক করে দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগে চিংড়ি রফতানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। কিছু অসাধু ব্যক্তির লোহা মেশানোর কারণে এটা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চিংড়ির সঙ্গে লোহা মেশালে বিদেশীরা তা খাবে না এবং এতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং অসৎ পন্থা অবলম্বনকারীদের মনে রাখতে হবে যে এ ধরনের কর্মকা- শাস্তিযোগ্য।
তিনি বলেন, তাঁর সরকার চিংড়ি, মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির জন্য বিভিন্ন বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকার কাছে সাভারে একটি এবং চট্টগ্রাম ও খুলনায় ২টি আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণাগার স্থাপনের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কক্সবাজারে আরো একটি আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণাগার স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।

প্রধানমন্ত্রী মাছের যথাযথ বাজারজাত ও প্রক্রিয়াকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, ৮০ থেকে ৯০ লাখ বাংলাদেশী বর্তমানে বিভিন্ন দেশে কাজ করছে।
তিনি বলেন, রফতানি বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মৎস্যের অভ্যন্তরীণ বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে শুধুমাত্র মাছের উৎপাদনই যথেষ্ট নয়। আমরা মাছের বাজারজাত ও প্রক্রিয়াকরণেরও উদ্যোগ নিয়েছি।
শেখ হাসিনা আমাদের ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’ চিরাচরিত এই প্রবাদবাক্য সমুন্নত রাখতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করতে মৎস্য সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিটি সেক্টরে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন এবং মৎস্য সেক্টরের প্রত্যেককে দেশের একজন উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে দেখতে চাই। সুতরাং আমি আপনাদের কাছে প্রত্যাশা করি, আপনারা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, আন্তরিকতা এবং দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করে আমাদের ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’ পরিচয় সমুন্নত রাখবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ মৎস্য সম্পদের সঙ্গে কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত। ১৩ লাখের বেশি মানুষ সার্বক্ষণিক মৎস্য পেশায় জড়িত রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের মৎস্য সম্পদ জিডিপিতে ৪ শতাংশ অবদান রাখছে এবং কৃষি জিডিপি’তে ২২.৬০ শতাংশ অবদান রাখছে।
তিনি বলেন, জাতির পিতার ভবিষ্যৎ বাণী এখন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। দেশের মৎস্য খাত মোট প্রোটিনের চাহিদার ৬০ শতাংশ পূরণ করছে।
প্রধানমন্ত্রী মৎস্য খাতে উন্নয়নের জন্য তাঁর সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, তাঁর সরকার ১৯৯৬-২০০১ সালের মেয়াদকালে প্রথম জাতীয় নীতি-১৯৯৮ প্রণয়ন করে। এই নীতির আলোকে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য পোনা অবমুক্ত করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ১৯৯৭ সালে মৎস্য বিভাগকে ‘এডোয়ার্ড সাওমা এ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার জলমহল নীতি, মৎস্য হ্যাচারি আইন ও নীতি, মৎস্য ফিড আইন ও নীতি এবং জাতীয় চিংড়ি নীতি ২০১৪ প্রণয়ন করেছে।
তিনি বলেন, তাঁর সরকারের এ সকল পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫.৪৮ লাখ টন হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ গত ৬ বছরে চিংড়ি, মৎস্য ও মৎস্য জাত পণ্য রফতানি করে ২৫,১৩৫ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে।
তিনি মৎস্যজীবীদেরকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে মা ইলিশ এবং জাটকা মাছ ধরা বন্ধে তাঁর সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে।
তিনি বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন গত ৬ বছরে ৩.৮৫ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।
শেখ হাসিনা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা জয় সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মালিকানা পেয়েছে। তিনি বলেন, এই বিপুল পরিমাণ জলসীমানা মৎস্য আহরণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং বিপুলসংখ্যক লোকের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রী সমুদ্র সম্পদ আহরণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি বলেন, আমরা আমাদের সম্পদ হিসেবে গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেব। তিনি বলেন, এখন আমাদেরকে ভাবতে হবে, আমাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই সম্পদ আমরা কিভাবে ব্যবহার করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে তাঁর সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে জাতীয় পর্যায়ে মৎস্য খাতে উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০ জন ও সংগঠনকে এ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী পরে শেরেবাংলা নগরে গণভবন পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৫ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। (বাসস) :

সর্বশেষ আপডেটঃ ৯:০২ অপরাহ্ণ | জুলাই ২৯, ২০১৫